সুদের ব্যবসা সংক্রান্ত টাকার লেনদেন নিয়ে কৃপেশ হত্যাকাণ্ড, বিবরণ দিল খুনি আপন বর্মন

 

স্টাফ রিপোর্টার, সোনামুড়া, ৪ মে।। সুদের ব্যবসা সংক্রান্ত টাকার লেনদেন নিয়ে পরিকল্পিত ভাবে খুন করেন কলমচৌড়ার অগ্নি নির্বাপক কর্মী আপন বর্মন। অভিযুক্ত খুনি আপন বর্মন আজ কিভাবে সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল তা নিজের মুখেই স্বীকার করেছেন। এবং সেই এলাকায় সে কীভাবে খুন করেছিল তার সরোজমিনে ব্যাখ্যা দিয়েছে পুলিশের সামনে।মানিক্যনগর ও কলমচৌড়া বাইপাস রাস্তার প্রায় ৫০০ মিটার ভিতরে ও.এন.জি.সি ড্রিলিং সাইডের একটি পরিত্যক্ত জায়গায় এক অজ্ঞাত ব্যক্তির আগুনে ঝলসানো লাশ উদ্ধার ঘিরে এলাকায় চাঞ্চল্য বিরাজ করেছিল এলাকায়।

ঘটনা বক্সনগর ব্লক অন্তর্গত কলমচৌড়া থানাধীন মানিক্যনগর গ্রাম পঞ্চায়েতের (৬)নং ওয়ার্ড এলাকায়।জানা যায়,মানিক্যনগর এলাকার সুবোধ নমঃ নামে এক ব্যক্তি জঙ্গল থেকে নিজের গৃহপালিত প্রাণী গরু বাড়িতে আনতে গেলে হঠাৎ চোখে পড়ে আগুনে ঝলসানো এক অজ্ঞাত ব্যক্তির মৃতদেহ।এই ঘটনাটি চাউর হতেই মিনিটের মধ্যে এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে পুরো ঘটনা।ঝড়ো হয়ে যায় ঘটনাস্থলে প্রচুর মানুষ।সঙ্গে সঙ্গে খবর দেওয়া হয় কলমচৌড়া থানায়।এই ঘটনার খবর পেয়ে কলমচৌড়া থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত এস.আই রিয়াঙ মনি হালাম পুলিশ বাহিনী নিয়ে ছুটে যান ঘটনাস্থলে। ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে অজ্ঞাত আগুনে ঝলসানো মৃত ব্যক্তির ঘটনা তদন্ত শুরু করে এবং খবর দেওয়া হয় পুলিশের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে।

ঘন্টাখানেক পর ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন সোনামুড়া মহকুমা পুলিশ আধিকারিক বনোজ বিপ্লব দাস।আগুনে ঝলসানো এবং শরীরে বহু আঘাতের চিহ্ন থাকায় মহকুমা পুলিশ আধিকারিক বনোজ বিপ্লব দাস ফরেনসিক দপ্তরকে ঘটনাটি জানায়।ফরেনসিক দপ্তরের আধিকারিকরা তৎক্ষণাৎ ঘটনাস্থলে এসে তাদের নিয়মনীতি অনুযায়ী তদন্ত শুরু করে এবং পরবর্তী সময়ে বক্সনগর সামাজিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রের মর্গে নিয়ে আসে। সংবাদ মাধ্যমে অপরিচিত মৃত ব্যক্তির লাশ উদ্ধারের ঘটনা শুনে বুধবার রাত আনুমানিক দশ ঘটিকার সময় আমতলী থানাধীন বাধারঘাট শ্রীপল্লি এলাকার নিখোঁজ হওয়া কৃপেশ দেবের পরিবারের লোকজন কলমচৌড়া থানায় আসে।পরিবারের সঙ্গে আসেন আমতলী থানার ওসি সিদ্ধার্থ সংকর কর।

তারপর গভীর রাতে কলমচৌড়া থানায় ছুটে আসেন সোনামুড়া মহকুমা পুলিশ আধিকারিক বনোজ বিপ্লব দাস।বনোজ বাবু পরিবারের লোকজনদের সাথে কথা বলেন এবং হাসপাতাল মর্গে গিয়ে পরিবারের লোকজনদের উদ্ধার হওয়া লাশটিকে দেখানো হলে কৃপেশ দেবের ছেলে তাঁর বাবাকে চিনতে পারে এবং সঙ্গে সঙ্গে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।তার পর রাত আনুমানিক দশ ঘটিকায় পুনরায় ছুটে আসেন কলমচৌড়া থানায়।ঘটনার দায়িত্ব প্রাপ্ত অফিসার রিয়াঙমনি হালামের কাছ থেকে লাশের সঙ্গে পাওয়া জুতা,চাবি ও জামা কাপড় দেখে ১০০ শতাংশ কৃপেশ দেব কে তাঁর পরিবারের লোকজন চিনতে পারে।

তারপর কলমচৌড়া থানার পুলিশ অভিযুক্ত অগ্নিনির্বাপক কর্মী আপন বর্মনের কলমচৌড়াস্থিত নিজ বাড়িতে এবং মানিক্যনগর শ্বশুর বাড়িতে অভিযান চালায়।জানা যায়,গত ২৬শে এপ্রিল আপন বর্মনের এক ছায়াসঙ্গী স্কুটি দিয়ে কৃপেশ দেব কে বাড়ী থেকে আনেন এবং আপন বর্মন ফোন করে বলে আমি লোক পাঠিয়েছি তুমি চলে আসো। সুদের ব্যবসা সংক্রান্ত টাকা হিসাব করে দিয়ে দেব। আপন বর্মনের ছায়াসঙ্গী লোকটি স্কুটি দিয়ে আনার পর রাতেও আর বাড়ী ফিরেনি কৃপেশ।তাই কৃপেশের পরিবারের লোকজন আমতলী থানায় আপন বর্মনের নাম ধাম দিয়ে একটি নিখোঁজ ডায়েরী করেন। তখন আমতলী থানার পুলিশ তদন্তের স্বার্থে আপন বর্মনকে ডেকে এনে জোর জিঙ্গাসাবাদ করেন। তখন তিনি এ ব্যাপারে স্পষ্ট কোন কিছু জানেন না বলে অস্বীকার করেন। তখন তাঁকে পুলিশ ছেড়ে দেয়।

২৭শে এপ্রিল বিকেল সাড়ে তিনটা নাগাদ কলমচৌড়া থানাধীন মানিক্যনগর গভীর জঙ্গলে লাশটি উদ্ধার করে শনাক্ত করার পর আর আপন বর্মন কে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। তিনি রাজ্য থেকে গা ঢাকা দিয়েছেন বলে অনেকে অনুমান করেছিলেন।পরিবার সূত্রে খবর পাওয়া যায় যে,কৃপেশ দেব একজন অগ্নিনির্বাপক দপ্তরের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।চাকরি চলাকালীন সময়ে আপন বর্মনের সঙ্গে পরিচয় হয়। তখন থেকে তাদের পরিচয়। উল্লেখ্য যে,কৃপেশ দেব চাকুরী থেকে অবসর নিয়ে তিনি টাকা লেনদেন করে সুদের ব্যবসা করতেন। তখন আপন বর্মন কৃপেশ বর্মন থেকে পাঁচ লক্ষ টাকা সুদে ঋণ নিয়েছিলেন।

তাছাড়া আরো ষাট লক্ষ টাকা কৃপেশ দেব থেকে জিম্মা এনে অন্যান্য মানুষ কে দিয়েছে বলে জানা যায়।কৃপেশের বাড়ীতে কনস্ট্রাকশানের কাজ চলছে।তাই টাকার প্রয়োজন।এই জন্য পাওনা টাকা খুঁজাখুঁজি নিয়ে নিখোঁজ হওয়ার কয়েক দিন আগে থেকেই বাকবিতণ্ডা সহ সামান্য ঝগড়া চলছিল বলে সূত্রের খবর। আসামি আপন বর্মনের সাথে কথা বলে জানতে পারা যায় তিনি ঠিকই কৃপেশ থেকে সুদে টাকা নিয়েছিলেন, তবে সে নিজের জন্যে নয় অন্যদের জন্য টাকা ধার দিয়ে যেতেন।

কিন্তু কয়েকদিন যাবত সুদের ব্যবসায়িক কৃপেস দেব আপন বর্মন কে ফোনে গালাগালি করে,তাই এসব গালাগালি সহ্য করতে না পেরে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তাকে ডেকে এনে ফিল্মি কায়দায় প্রথমে খুন করে তারপর আগুন দিয়ে তার শরীর ঝলসে দেয়।তার সাথে সহযোগী হিসেবে আরও দুইটি যুবক ছিল। জানা যায় দুই সহযোগী মানিক্যনগর এলাকার। তারা দুই বন্ধু তাদের দা,ছুরি ও পেট্রোল ভেলুয়ারচর বাজার থেকে নিয়ে যেতে সাহায্য করে। তবে তাকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় এই খুনের সাথে সে নিজেই জড়িত। তাকে দুইজন পেট্রোল ও অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল। এখন এই পুলিশ তদন্তে তাদের নাম বেরিয়ে আসবে।কৃপেস হত্যাকাণ্ডের ২৪ ঘণ্টা পার না হতেই সোনামুড়া মহকুমা পুলিশ আধিকারিক বনুজ বিপ্লব দাসের তৎপরতায় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৮ ঘটিকার সময় তার বাড়ির পাশে একটি জঙ্গল থেকে গোপন খবর পেয়ে আটক করে কলমচৌড়া থানায় নিয়ে আসে।

থানায় তাকে মহাকুমা পুলিশ আধিকারিক দীর্ঘখন টানা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে অনেকেই মনে করেন।তারপর রাতেই তাকে আমতলী থানা থেকে ওসি ও পুলিশ এসে নিয়ে যায়।গ্রেপ্তারের পর কৃপাশের পরিবার দারুণ খুশি।এই টাকার সাম্রাজ্য লুট করার বদউদ্দেশ্যে কৃপেশকে শেষ পর্যন্ত খুন হতে হয়েছে আপন বর্মনের হাতে।আবার খুন করে অনতিদূরে কলমচৌড়া থানাধীন মানিক্যনগর গভীর জঙ্গলে লাশটি গুম করে। কিন্তু এতেও আপনের হত্যা কান্ডের নীল নকশা পুলিশের কাছে ধরা পড়ে গেল। পুলিশ হন্যে হয়ে ঘুরে অভিযুক্ত খুনি আপন বর্মন কে পুলিশের জালে তোলে নেয় বৃহস্পতিবার রাতেই।

পুলিশের তৎপরতায় অতি শীঘ্রই আপন বর্মন পুলিশের জালে উঠায় সংশ্লিষ্ট মহলে দারুণ খুশি। এদিকে বুধবার অবসরপ্রাপ্ত ফায়ার সার্ভিস কর্মী কৃপেশ চন্দ্র দেবর খুনের মূল অভিযুক্ত আপন বর্মন কে নিয়ে পুলিশ বক্সনগর আসে খুনি ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধারের জন্য। আপন বর্মন জানায় ছুরি দিয়ে কৃপেশ চন্দ্র দেব কে হত্যা করেই মৃতদেহ পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে দিয়েছিল। বলে জানিয়েছে পুলিশ কে। এ ঘটনায় রীতিমতো চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে এলাকায়।

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *